সোমবার ৩ আগস্ট ২০২৬ - ১০:৩৪
তথ্যের যুগে পথহারাদের পথপ্রদর্শক সালমান আল-ফারসি

এমন এক সময়ে আমরা বাস করছি, যখন স্মার্টফোনের পর্দায় প্রতিনিয়ত হাজারো সংবাদ, বিশ্লেষণ ও তথ্য ভেসে আসে। এই তথ্যের স্রোতে গুজব, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর বর্ণনার আড়ালে সত্য অনেক সময় চাপা পড়ে যায়। এমন বাস্তবতায় সালমান আল-ফারসির জীবন আমাদের শেখায়—কোনো সংবাদ বিশ্বাস করার আগে, তা অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আগে কিংবা কাউকে নিয়ে মত গঠনের আগে গভীরভাবে চিন্তা ও যাচাই করা কতটা জরুরি।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইরানের ইস্ফাহান থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সত্যের সন্ধানে জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছিলেন সালমান আল-ফারসি। তাই কোনো খবর গ্রহণ বা প্রচারের আগে তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

সালমান আল-ফারসি এমন এক আদর্শ ব্যক্তিত্ব, যিনি মনে করিয়ে দেন—সত্য কখনো সহজে ধরা দেয় না; তাকে খুঁজে পেতে প্রয়োজন অনুসন্ধিৎসা, ধৈর্য এবং মুক্তচিন্তা।

ইতিহাসে কেউ যুদ্ধজয়ের জন্য, কেউ সভ্যতা নির্মাণের জন্য, আবার কেউ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। সালমান আল-ফারসি ছিলেন শেষোক্তদের একজন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম ছিল চিন্তার জগতে। তিনি প্রচলিত বিশ্বাসকে অন্ধভাবে মেনে নেননি; বরং সত্যের সন্ধানে নিজের স্বাচ্ছন্দ্য, পরিবার ও জন্মভূমি ত্যাগ করেছিলেন।

যদি তিনি জন্মভূমিতেই থেকে যেতেন এবং শৈশব থেকে শেখা বিশ্বাসগুলো প্রশ্নহীনভাবে মেনে নিতেন, তবে হয়তো ইতিহাসে তাঁর নাম এভাবে উজ্জ্বল হয়ে থাকত না। তাঁকে অমর করে রেখেছে প্রশ্ন করার সাহস—যে সাহস আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তথ্যবন্যার যুগে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।

আজ তথ্য জানার জন্য কাউকে আর মাসের পর মাস ভ্রমণ করতে হয় না। একটি স্মার্টফোনেই মুহূর্তের মধ্যে হাজারো সংবাদ, ছবি, ভিডিও ও বিশ্লেষণ পৌঁছে যায়। কিন্তু তথ্যের এই সহজলভ্যতা সত্যের নিশ্চয়তা দেয় না। অনেক সময় গুজব, অসম্পূর্ণ তথ্য ও তড়িঘড়ি করা বিশ্লেষণের আড়ালে সত্য চাপা পড়ে যায়।

তাই সালমান আল-ফারসিকে স্মরণ করা শুধু একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করা নয়; বরং এমন এক চিন্তাপদ্ধতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, যা শেখায়—বিশ্বাস করার আগে অনুসন্ধান করতে হবে, গ্রহণ করার আগে ভাবতে হবে।

সত্যের সন্ধানে এক দীর্ঘ যাত্রা
সালমান আল-ফারসির জন্ম ইরানে, যে ভূখণ্ড যুগে যুগে নানা সংস্কৃতি, সভ্যতা ও চিন্তাধারার মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত। তিনি এক জরথুস্ত্রী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসরণ করেই জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন, কিন্তু একটি প্রশ্ন তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি ঘর ছেড়ে দূরদেশে পাড়ি জমান। বিভিন্ন ধর্মের জ্ঞানী ও পণ্ডিতদের সান্নিধ্যে যান, দীর্ঘ ভ্রমণের কষ্ট সহ্য করেন, এমনকি দাসত্বের জীবনও কাটান। কিন্তু সত্য জানার আকাঙ্ক্ষা কখনো নিভে যায়নি।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা হয়তো গন্তব্যে পৌঁছানো নয়, বরং সেই দীর্ঘ অনুসন্ধানের পথ। তিনি দেখিয়েছেন, সত্য তাদেরই নাগালে আসে, যারা ধৈর্য ধরে খোঁজে, প্রশ্ন করে এবং প্রয়োজনে নিজের ধারণা পরিবর্তন করতেও দ্বিধা করে না।

জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার এক অনন্য সেতুবন্ধ
দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর সালমান আল-ফারসি মদিনায় এসে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সান্নিধ্যে পৌঁছান। তাঁর অনুসন্ধানের যাত্রা সেখানে শেষ হলেও সমাজে তাঁর অবদান তখনই শুরু হয়।

ইসলামের ইতিহাসে তাঁকে একজন প্রজ্ঞাবান, ধৈর্যশীল ও পরামর্শপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মদিনা যখন শত্রুদের অবরোধের মুখে পড়ে, তখন তিনি ইরানে প্রচলিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা—নগরের চারপাশে পরিখা (খন্দক) খননের পরামর্শ দেন। আরবদের কাছে এটি ছিল নতুন ধারণা, কিন্তু সেই কৌশল যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেয়। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই।

সালমান নিজের অতীত বা সাংস্কৃতিক পরিচয়কে অস্বীকার করেননি। বরং নিজের দেশের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান যথাসময়ে মানবকল্যাণে কাজে লাগিয়েছিলেন। এ কারণেই তিনি যেমন ইরানের ইতিহাসে সম্মানিত, তেমনি ইসলামের ইতিহাসেও বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।

সময় বদলেছে, কিন্তু প্রশ্ন একই
সালমান আল-ফারসি যদি আজকের পৃথিবীতে বেঁচে থাকতেন, তবে হয়তো একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তাঁকে মাসের পর মাস ভ্রমণ করতে হতো না। কয়েকটি অনলাইন অনুসন্ধানেই তাঁর সামনে হাজির হতো হাজারো নিবন্ধ, ভিডিও, বিশ্লেষণ ও মতামত। কিন্তু তাতে কি সত্য খুঁজে পাওয়া সহজ হতো?

উত্তরটি সহজ নয়। আধুনিক মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি তথ্যের নাগাল পেলেও একই সঙ্গে ভুয়া খবর, বিভ্রান্তিকর তথ্য, বিকৃত ছবি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিশ্লেষণের মুখোমুখি হচ্ছে। একটি সত্য সংবাদ এবং একটি গুজবের মধ্যে ব্যবধান কখনো কখনো মাত্র কয়েক সেকেন্ড—যে সময়ে একটি বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

আজকের বাস্তবতায় সালমান আল-ফারসির সবচেয়ে বড় শিক্ষা এক বাক্যে বলা যায়—প্রতিটি প্রচারিত তথ্যই সত্য নয়।

তিনি কখনো প্রথম শোনা কথাতেই বিশ্বাস করেননি। তিনি শুনেছেন, তুলনা করেছেন, যাচাই করেছেন এবং তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আধুনিক গণমাধ্যম-সাক্ষরতার (Media Literacy) অন্যতম মৌলিক নীতিও এটিই—কোনো তথ্য যাচাই ছাড়া বিশ্বাস করা নয়, উৎস পরীক্ষা করা এবং অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আগে একবার ভেবে দেখা।

আজকের বিশ্বে লড়াই শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; তথ্য, বর্ণনা ও জনমত গঠনের ক্ষেত্রেও প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা চলছে। তাই সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি এখন আর শুধু ব্যক্তিগত গুণ নয়; এটি একটি সামাজিক প্রয়োজন।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha